ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া এবং ভোট চুরির অভিযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে প্রকাশ্যে মুখোমুখি বিতর্কে অংশ নেওয়ার সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। ওই চ্যালেঞ্জের তীব্র জবাব দিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন, এসআইআর বা এই ধরনের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু নিয়ে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকতে সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত; রাহুল যেন পালিয়ে না বেড়িয়ে সরাসরি সংসদে এসে এই বিতর্কে অংশ নেন।
অমিত শাহর এই পাল্টা বক্তব্যের পরই রাজনীতির পারদ চরমে ওঠে। অমিত শাহর পরপর দেওয়া দুটি ভিন্ন সময়ের বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপিংস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে সরকারি দলের মধ্যে নীতিগত ‘দ্বিচারিতা’র কঠিন প্রমাণ তুলে ধরেন রাহুল গান্ধী। এই প্রসঙ্গে রাহুল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও কৌতুকপূর্ণ সুরে মন্তব্য করেছেন যে, সরকারের এই সাংঘর্ষিক অবস্থান দেখে ‘তাঁদের আমি পাগল করে দেব’ এবং সরকারি নীতিনির্ধারকরা এখন পুরোপুরি ‘বিভ্রান্তিতে পড়ে গেছে’।
কেন এই বিভ্রান্তি এবং কীভাবে সরকারের দ্বিচারিতা প্রমাণ করলেন রাহুল, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি জানান যে, এসআইআর বা নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে অমিত শাহ নিজের সুবিধা অনুযায়ী বিভিন্ন সময়ে সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলছেন। রাহুল তাঁর মূল চ্যালেঞ্জে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্দেশে বলেছিলেন, বিতর্কের স্থান, সময় ও শর্ত প্রধানমন্ত্রী নিজেই ঠিক করুন। এমনকি বিতর্কের মঞ্চে বিচারক হিসেবে রাষ্ট্রিয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবতকে রাখলেও তাঁর কোনো আপত্তি নেই। সেই মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী, রাহুল স্বয়ং, সাধারণ জনগণ ও গণমাধ্যম সবাই উপস্থিত থাকবে এবং কোন পক্ষ আসলে দেশপ্রেমী আর কারা দেশদ্রোহী, তার ফয়সালা সেদিনই হয়ে যাবে।
রাহুল আরও দাবি করেন, অতি দ্রুততার সঙ্গে এবং মন্ত্রিসভাকে অন্ধকারে রেখে কেন ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো, ভারতের অন্যতম শীর্ষ শিল্পপতি গৌতম আদানির বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে দায়ের হওয়া দুর্নীতির মামলা কেন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল, কিংবা বর্তমান সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা কার কৃপায় ক্ষমতায় টিকে আছেন—এই সমস্ত গুরুতর প্রশ্নের উত্তর সেই উন্মুক্ত বিতর্কে পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং ‘কতটা দুধ আর কতটা জল’ তা দেশের মানুষের সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে।
প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হরিয়ানার একটি জনসভায় বলেছিলেন যে, খোলা ময়দানে বিতর্কের কোনো প্রয়োজন নেই; রাহুল বরং সাহস থাকলে সংসদে আসুন। এসআইআর নিয়ে আলোচনার জন্য প্রয়োজনে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার ঘোষণা দিয়ে শাহ বলেছিলেন, সংসদেই এই নিয়ে বিস্তারিত বিতর্ক হোক।
অমিত শাহর ঠিক এই বক্তব্যটিকেই নিজের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন রাহুল গান্ধী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে অমিত শাহকে উদ্দেশ্য করে এক পোস্টে রাহুল লিখেছেন, ‘মোদিজিকে বিভ্রান্ত করবেন না। আমার সঙ্গে খোলাখুলি বিতর্কে বসতে শুধু তাঁকে রাজি করান। যেকোনো মঞ্চে। যেকোনো সময়। ভয় পাবেন না।’
নিজের এই দাবির পক্ষে প্রমাণ হিসেবে অমিত শাহের নির্বাচন কমিশনের এসআইআর–সংক্রান্ত দুটি ভিন্ন সময়ের বক্তব্যের ভিডিও পাশাপাশি তুলে ধরেন রাহুল। প্রথম ভিডিওটি ছিল গত বছরের অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বরের, যখন এসআইআর নিয়ে আলোচনার দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠা সংসদে অমিত শাহ বলেছিলেন যে, এই বিষয়ে সংসদে কোনো আলোচনা হতেই পারে না। কারণ হিসেবে তিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, সংসদীয় চর্চা চলাকালীন যেসব প্রশ্ন বা বিষয় উঠবে, তার তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়ার জন্য মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বা অন্য কমিশনাররা তো সরাসরি সভায় উপস্থিত থাকতে পারবেন না, কারণ নির্বাচন কমিশন সরকারের সরাসরি অধীনস্থ কোনো বিভাগ নয়।
কিন্তু এর ঠিক এক বছর পর চলতি বছরের ৫ নভেম্বর হরিয়ানার জনসভায় দেওয়া ভাষণে অমিত শাহ সম্পূর্ণ উল্টো সুরে রাহুলকে সংসদীয় বিতর্কে বসার পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন এবং এসআইআর নিয়ে আলোচনার জন্য সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার কথা ঘোষণা করেন। এই এক বছরের ব্যবধানে অমিত শাহর মুখে এই দুই বিপরীত অবস্থানের কথা তুলে ধরে রাহুল দাবি করেন যে, সরকারের ভেতরে এই নীতিগত বিভ্রান্তি এবং কথার বরখেলাপ আজ পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে গেছে।
অমিত শাহর এই মন্তব্যের জেরে শাসকদল বিজেপির শীর্ষ নেতারাও রাহুলের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেন। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশি রাহুল গান্ধীকে নিশানা করে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি কড়া পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন যে, সরকারের নীতিতে কোনো বিভ্রান্তি নেই, বরং বিভ্রান্তিতে রয়েছেন খোদ রাহুল গান্ধী নিজেই। যখন নির্বাচনে জয়লাভ করেন, তখন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ও গণতন্ত্র তাঁর কাছে সঠিক ও নির্ভুল বলে মনে হয়; আর যখনই নির্বাচনে পরাজয় বরণ করতে হয়, তখনই তিনি পুরো নির্বাচন পদ্ধতি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। প্রহ্লাদ যোশি আরও বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন ইতিমধ্যেই তাঁকে সংসদে এসে এসআইআর নিয়ে বিশেষ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার প্রকাশ্য আহ্বান জানিয়েছেন, তখন কংগ্রেস নেতার আর কোনো দ্বিধা বা নাটক না করে সরাসরি সংসদে আলোচনা অংশ নেওয়া উচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা জোরালোভাবে অমিত শাহর পক্ষে দাঁড়িয়ে রাহুলকে আক্রমণ করলেও, এসআইআর বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে সরকারের আগের অনীহা এবং বর্তমানের চ্যালেঞ্জের মধ্যে যে বড় ধরনের তফাত ও যুক্তিগত অমিল রয়েছে, তা খুব সহজেই এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। রাহুল গান্ধী সুকৌশলে এই বিষয়টিকে সামনে এনে সরকারপক্ষকে তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক উভয় সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছেন।



