দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধিতে আরও ক্ষমতাধর শি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ ও গোয়েন্দা সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারাও এই অভিযানের আওতায় পড়ছেন। এমনকি শি জিনপিংয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরাও বাদ যাচ্ছেন না। এতে চীনের রাজনৈতিক অঙ্গনে অনিশ্চয়তা বাড়লেও প্রেসিডেন্টের নিজের ক্ষমতার অবস্থান আরও সংহত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিংয়ের উপমেয়র শিয়া লিনমাওকে তদন্তের আওতায় আনার ঘটনা রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর কয়েক দিন আগেই তাঁকে মার্কিন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টের প্রধান নির্বাহী জন ফার্নারের সঙ্গে বৈঠকে দেখা গিয়েছিল। ওই বৈঠকে বেইজিংয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে মার্কিন ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করা হয়েছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি জনসমক্ষে অনুপস্থিত হয়ে পড়েন।
এ ঘটনায় চীনের ক্ষমতাসীন দলের কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের পরিধি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে শীর্ষ পর্যায়ের পদধারীরাও নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারছেন না। সাবেক বিচারপতি, গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তা, সামরিক জেনারেল এবং দুর্নীতি দমনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও তদন্ত ও বহিষ্কারের মুখে পড়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা সাংবিধানিক মেয়াদসীমার চাপে নেই শি জিনপিং। ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি দেশটির প্রশাসন ও কমিউনিস্ট পার্টির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছেন। আগামী বছর দলের গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে তাঁর চতুর্থ মেয়াদে নেতৃত্বে থাকার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে।
গত এক দশকের বেশি সময়ে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে লাখ লাখ কর্মকর্তা শাস্তির মুখে পড়েছেন। চীনের কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা পরিদর্শন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মন্ত্রী পর্যায়ের ৫০০ জনের বেশি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত, বিচার ও দলীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে গত তিন বছরেই ৪১০ জনের বেশি কর্মকর্তাকে পদচ্যুত বা দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
শুধু বেসামরিক প্রশাসন নয়, সামরিক নেতৃত্বেও বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের সদস্যসংখ্যা কমে বর্তমানে দুজনে দাঁড়িয়েছে, যাঁদের একজন শি জিনপিং নিজেই। একইভাবে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা পলিটব্যুরোর ২৪টি পদের মধ্যে বর্তমানে ২১টি পদে সদস্য রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক অভিযানে আলোচনায় এসেছেন চংকিংয়ের সাবেক মেয়র হুয়াং কিফানও। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিক দলীয় নেতার অধীনে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তা একসময় রাজনৈতিকভাবে বেশ প্রভাবশালী ছিলেন। অবসরের পরও বিভিন্ন অর্থনৈতিক সম্মেলন ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিতেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর খবর প্রকাশের পর পরিচিত অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছবি ও তথ্য সরিয়ে ফেলেছেন।
এ ছাড়া জিনজিয়াং অঞ্চলের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা মা শিংরুইয়ের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে। দীর্ঘ পাঁচ মাস জনসমক্ষে তাঁকে দেখা না যাওয়ার পর গত এপ্রিলে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
সামরিক বাহিনীতেও শুদ্ধি অভিযানের প্রভাব ব্যাপক। ২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের সাত সদস্যই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালে একই ধরনের অনুষ্ঠানে শি জিনপিংয়ের পাশে মাত্র একজন সদস্যকে দেখা যায়। সাবেক দুই প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েই ফেংহে ও লি শাংফুর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে বিচার শেষে দুই বছরের স্থগিতাদেশসহ মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেওয়া হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এত ব্যাপক অভিযানের ফলে চীনের প্রশাসনে অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে শি জিনপিংয়ের পর কে নেতৃত্ব দেবেন, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই। অতীতের চীনা নেতাদের মতো প্রকাশ্যে কোনো উত্তরসূরি প্রস্তুত করার উদ্যোগও এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।
তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই পরিস্থিতি শি জিনপিংয়ের জন্য রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে। কারণ, নতুন যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসছেন, তাঁদের নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে দলের ভেতরে তাঁর প্রতি আনুগত্য আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
চীনের সাবেক দলীয় প্রকাশনা ‘স্টাডি টাইমস’-এর উপসম্পাদক দেং ইউওয়েনের মতে, তরুণ কর্মকর্তারা এখন শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বের প্রতিই বেশি মনোযোগী। তাঁর ধারণা, শি যাঁকেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেবেন, সময়ের সঙ্গে তাঁকে নিজের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে পারবেন।
সব মিলিয়ে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চীনের প্রশাসন ও সামরিক নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। তবে দুর্নীতি দমনই এই অভিযানের একমাত্র উদ্দেশ্য, নাকি এর মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্র আরও শক্তিশালী হচ্ছে—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।



