চীনের ক্ষোভে ক্ষমা চাইলেন এমবাপ্পে, বিপাকে হ্যালো কিটি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার মুখে পড়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছেন ফরাসি ফুটবল তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। একই সময়ে চীনা গ্রাহকদের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখে জাপানি প্রতিষ্ঠান স্যানরিও তাদের জনপ্রিয় চরিত্র হ্যালো কিটিকে ঘিরে একটি বিশেষ বিপণন উদ্যোগ বাতিল করেছে। পৃথক দুটি ঘটনায় আবারও স্পষ্ট হয়েছে, চীনের বাজারে ব্যবসা ও জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে বিদেশি তারকা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশটির রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
ঘটনার সূত্রপাত একটি ফরাসি টক শোতে এমবাপ্পের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। সেখানে একটি ইন্টারনেট মিম নিয়ে কথা বলার সময় তাঁর মুখ চীনের সাবেক নেতা মাও সেতুংয়ের ছবির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া প্রসঙ্গ উঠে আসে। এ প্রসঙ্গে এমবাপ্পে মাওকে একজন চীনা স্বৈরশাসক হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর এই মন্তব্য চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
এরপর চীনে এমবাপ্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ব্র্যান্ড তাদের অংশীদারত্ব থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও তাঁর বিজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট প্রচারমূলক কনটেন্ট সরিয়ে ফেলা হয়। পাশাপাশি এমবাপ্পে ও স্প্যানিশ ফুটবল লিগ লা লিগার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ম্যাচ ও অনুষ্ঠান সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন এমবাপ্পে। তিনি জানান, তাঁর মন্তব্যটি যথাযথ ছিল না এবং এর মাধ্যমে চীন ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত চীনা জনগোষ্ঠীর অনেকের মনে আঘাত লেগেছে—এটি তিনি উপলব্ধি করেছেন। লা লিগাসহ তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও চীনা অংশীদারদের প্রতি সম্মান ও গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
এমবাপ্পেকে ঘিরে বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়ে জাপানের প্রতিষ্ঠান স্যানরিও। হ্যালো কিটি, মাই মেলোডি, কুরোমি ও সিনামোরলের মতো জনপ্রিয় চরিত্রের স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানটি জাপানি গোয়েন্দা কাহিনিনির্ভর টেলিভিশন সিরিজ ‘ভিভান্ট’-এর সঙ্গে যৌথভাবে পণ্য বাজারজাত করার উদ্যোগ নিয়েছিল।
কিন্তু সিরিজটির বিরুদ্ধে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেশবিরোধী উপস্থাপনার অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে এতে জাপানি গুপ্তচরদের ওপর চীনা গোয়েন্দাদের নির্যাতনের দৃশ্য দেখানো নিয়ে চীনা দর্শকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্যানরিওর উদ্যোগেরও সমালোচনা শুরু হয়।
পরিস্থিতি বিবেচনায় বৃহস্পতিবার নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠানটি। এক বিবৃতিতে স্যানরিও জানায়, সহযোগিতামূলক প্রকল্পটির কিছু উপস্থাপনা তাদের করপোরেট মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই চলমান উদ্যোগের পাশাপাশি পরবর্তী প্রকল্প ও প্রচারণামূলক কার্যক্রমও বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোতে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষমা চাওয়াসংক্রান্ত হ্যাশট্যাগ ১৮ কোটির বেশি বার দেখা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুনও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, জাপানের কিছু মহল সাংস্কৃতিক পণ্য ব্যবহার করে চীনকে হেয় করা এবং দেশটির বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের বাজারে বিদেশি ব্র্যান্ড ও তারকাদের জন্য এ ধরনের বিতর্ক নতুন নয়। ২০১৮ সালে ডলচে অ্যান্ড গাব্বানা, ২০১৯ সালে ভার্সাচে ও এনবিএ এবং ২০২১ সালে এইচঅ্যান্ডএম ও নাইকিও বিভিন্ন বিতর্কের মুখে পড়েছিল। হংকং, তাইওয়ান, মাকাওয়ের রাজনৈতিক অবস্থান এবং চীন-জাপানের ঐতিহাসিক বিরোধের মতো বিষয়গুলো প্রায়ই এসব বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে।
চায়না মার্কেট রিসার্চ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শন রেইনের মতে, চীনা ভোক্তারা নিজেদের দেশ ও জনগণের প্রতি অসম্মানজনক বলে মনে হতে পারে—এমন বক্তব্যের বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই দেশটিতে ব্যবসা করতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হয়।
অন্যদিকে, বিশাল ভোক্তাবাজারের কারণে চীনকে উপেক্ষা করাও বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কঠিন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই স্যানরিওর চীনভিত্তিক ব্যবসা থেকে ১১ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয় হয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের বাজারে একবার আস্থা হারালে তা পুনরুদ্ধার করতে দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয় হতে পারে। এমবাপ্পে ও স্যানরিওর সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বিদেশি তারকা এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন করে সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে।



